পর্ন আসক্তি কারণ
বিভিন্ন কারণে পর্নে আসক্তি জন্মাতে পারে। যেমন:
আপনি যখন পর্ন দেখেন তখন শরীর থেকে ডোপামিন নামক এক ধরণের হরমোন নিঃসৃত হয়। ডোপামিনের মূল কাজ কম কষ্টদায়ক কাজের মাধ্যমে মস্তিষ্কের আরাম খোঁজা। যেহেতু পর্ণ দেখার সময় ডোপামিন নিঃসৃত হয় ও মস্তিষ্ক তৃপ্তি অনুভব করে তাই বলা যায় পর্ণ আসক্তির অন্যতম কারণ হলো ডোপামিন।
পর্ণ আসক্তির আরও একটি অন্যতম প্রধান কারণ ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা। ড. কার্লো ফরেস্টা বলেন- “ইন্টারনেট পর্ন তরুণদের যৌনক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে”
মোবাইল, ল্যাপটপ যেকোনো স্থানে বহন করা যায় ফলে এটি মানুষ যেকোনো সময় দেখতে পারে এজন্যই আসক্তি বাড়ছে।
পর্ণ মানবপাচারের অন্যতম প্রধান কারণ। ৬-৮ লক্ষ নারী ও শিশু মানবপাচারের শিকার হয় এবং এদের বেশির ভাগেরই জায়গা হয় ইউরোপ-আমেরিকার পর্ন ইন্ডাস্ট্রি এবং পতিতালয়ে।
পর্ণ আসক্ত বিবাহিত নারী পুরুষের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পর্ণ আসক্ত জীবনসঙ্গীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের আশঙ্কা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আমেরিকার ৫৬% বিবাহ-বিচ্ছেদের মূল কারণ জীবনসঙ্গীর পর্ণ আসক্তি।
সুস্থ বিনোদনের অভাব।
সঠিক ও প্রাথমিক যৌনশিক্ষার অভাব।
অনেকেই আশেপাশের পরিবেশ থেকে প্রভাবিত হন।
শৈশবে নির্যাতনের শিকার হবার কারণে।
বন্ধু-বান্ধবদের প্রভাবের কারণে পর্ণ দেখা শুরু করা। নৈতিকতার অভাবে।পর্ন আসক্তি যেমন আপনার ব্যক্তিত্ত্বকে নষ্ট করে তেমনি আপনার পবিত্র অনুভূতিগুলোকেও পিষে দেয়। পর্ন আসক্তির থাবা ভয়াল থাবা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, খুঁজতে হবে মুক্তির পথ।
জেনে নিন পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তির উপায়:
১. মন থেকে সিদ্ধান্ত নিনঃ
আর কতকাল নীল আলোর অন্ধকার জগতে মুখ লুকিয়ে রাখবেন? বেরিয়ে এসে দেখুন পৃথিবী আপনার অপেক্ষায়। হয়তো সময় এসেছে। তাই মন থেকেই সিদ্ধান্ত নিন আপনি আর নীল দুনিয়ায় প্রবেশ করবেন না। পর্ন আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য সর্বোপরি নিজেকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। পর্নোগ্রাফিকে তাই “না” বলুন।
২. লক্ষ্য নির্ধারণ করুনঃ
আপনার জীবনে যদি কোনো লক্ষ্য বা গোল না থাকে তবে আপনি কোনো খারাপ অভ্যাসকে চাইলেও ছাড়তে পারবেন না। তবে আপনার জীবনে যদি লক্ষ্য থাকে এবং আপনার যদি পর্ন ভিডিও দেখতে ইচ্ছা হয় তবে চোখ বন্ধ করে আপনার লক্ষ্যকে কল্পনা করুন আর নিজেকেই প্রশ্ন করুন পর্ণ দেখলে কি আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন নাকি এটিই হবে চরম বাঁধা। তখন আপনার আর পর্ন দেখতে ইচ্ছা হবে না। তাই জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। গোল সেট করুন আর সেই গোল পূরণের স্বপ্ন দেখুন।
৩. ডিভাইস দূরে রাখুনঃ
পর্ণ আসক্তির অন্যতম কারণ যেহেতু ডিভাইসের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার তাই ফোন, ল্যাপটপ এসব ডিভাইসকে দূরে রাখুন। কোনো ভাবেই আসক্তি কমাতে না পারলে বাটন ফোন ব্যবহার করুন। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করুন। তবে তা ঘরের দরজা বন্ধ করে নয়। যেসকল সাইট থেকে পর্ণ দেখতেন তা ব্লক করুন বা ডাউনলোড করা ভিডিও, ছবি সবকিছু ডিলিট করুন। এতে আপনার পর্ণ আসক্তি ধীরে ধীরে কমে যাবে।
৪. বিপরীত জেন্ডারের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখুনঃ
পর্ণ আসক্তির ফলে বিপরীত জেন্ডারের প্রতি যৌন আগ্রহ জন্মে। কিন্তু পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তির উপায় অন্যতম উপায় হলো বিপরীত জেন্ডারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া৷ বিশেষ করে মেয়ে ও নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হউন। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে ফেলুন। মনে রাখবেন তারাও কারও বোন, মেয়ে বা মা৷ তাছাড়া জীবনসঙ্গিনীর সাথে স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করুন। তাকে সম্মান করুন, তার মতামতকে প্রাধান্য দিন।
৫. নিজেকে ব্যস্ত রাখুনঃ
আপনার অবশ্যই নিজেকে ব্যস্ত রাখা জরুরি। আপনি যখনই অলসতা করে কাজ করবেন না তখনই আপনার মনে বাজে চিন্তা আনাগোনা শুরু করবে এবং আপনি সেই নিষিদ্ধ কাজটিই করে ফেলবেন। তাই নিজেকে কাজে ব্যস্ত রাখুন সবসময়। প্রয়োজনে আগামীকাল কি কি কাজ করবেন তার একটি রুটিন বানিয়ে ফেলুন আগের দিন। ঘুমাতে যাবার আগে সেগুলোয় চোখ বুলিয়ে ঘুমাতে যান ও পরদিন নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করুন। আর যখন আপনার তীব্র আসক্তি হবে তখন যেসব কাজ করলে আসক্তি দূর হবে তার একটি তালিকা তৈরী করে সেগুলো করুন।
৬. নিরিবিলি পরিবেশে ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করুনঃ
যেহেতু পর্ন আসক্তি দীর্ঘদিনের তাই আপনি প্রথমে কয়েকদিন একনিষ্ঠ থাকলেও পরবর্তীতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারেন। এজন্য নিজেকেই সজাগ থাকতে হবে। মন চাইবে নিরিবিলি পরিবেশ খুঁজতে ও সেখানে গিয়ে ডিভাইস খুলে পর্ণ দেখতে। এক্ষেত্রে মনের লাগাম টানুন, মনকে বোঝান। কোনো অবস্থাতেই নিরিবিলি পরিবেশে, বদ্ধ ঘরে ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না। আসক্তি দূর করতে ও মাইন্ড ডাইভার্ট করতে আপনার পছন্দের অন্য কোনো কাজে লেগে পড়ুন। মন ঘুরে গেলে আসক্তি কমতে শুরু করবে।
৭. স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা করুনঃ
পর্ন আসক্ত ব্যক্তিরা অধিক মানসিক চাপ নিতে পারে না। অতিরিক্ত মানসিক চাপ বোধ হলেই সে পুনরায় নীল দুনিয়ায় প্রবেশ করে। তবে নিজেকে যতটা পারবেন স্ট্রেস ফ্রি রাখার চেষ্টা করুন।
৮. সাপোর্টিং গ্রুপের সাথে থাকুনঃ
আপনি হয়তো ভাবছেন আপনি একাই এই নীল আলোর মোহে জড়িয়ে যাচ্ছেন। এটা ভেবেই হয়তো আপনার মধ্যে লজ্জা, সংকোচ, হীন মানসিকতা এগুলো কাজ করছে। নিজেকে অপরাধী মনে হতে পারে, এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন আপনার মতো আরও অনেকেই আছেন যারা পর্ণে আসক্ত। তারাও ঠিক আপনার মতোই নিজেকে অপরাধী মনে করছেন। আপনি যদি শত চেষ্টা করেও পর্ণের প্রতি মোহ কমাতে না পারেন তবে আপনার উচিত আপনার মতো মানুষদেরকে খুঁজে বের করা যারা মুক্তি চায় কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের সাথে এগুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি গ্রুপ তৈরী করুন, একে অন্যকে সাহায্য করুন এই আসক্তি থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায়। আপনি অনেকটায় উপকৃত হবেন।
৯. আপনার পর্ণ আসক্তির বিষয়টি নির্দিষ্ট কারও সাথে শেয়ার করুনঃ
আপনি যে পর্ণে আসক্ত এই বিষয়টি নির্দিষ্ট কারও সাথে শেয়ার করুন। অবশ্যই সে হবে আপনার খুব কাছের কেউ এবং তাকে অবশ্যই গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। আপনি এই বিভীষিকাময় অন্ধকার জীবনের কথা শেয়ার করে একটু হালকা হতে পারেন। বিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নিন যিনি আপনাকে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সঠিক পথ দেখাবে। অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবে।
১০. একা থাকার অভ্যাস ত্যাগ করুনঃ
বাসায় একা থাকলে বা একা ঘুমালে আপনার আবার পর্ণ দেখতে ইচ্ছা হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি সেই সুযোগ নিজেকে দেবেন না। ঘরে, বাড়িতে বা রাতে ঘুমাতে গেলে একা থাকার অভ্যাস ত্যাগ করুন। রাতে কাউকে সাথে নিয়ে ঘুমাতে যান তাইলে আপনি আর পর্ণ দেখার সুযোগ পাবেন না।
১১. নিজেকে ভরসা করুনঃ
পর্ণ আসক্তি থেকে নিস্তার পেতে আপনার নিজেকে প্রতিজ্ঞা করা জরুরি। নিজেকে বোঝান, বিশ্বাস আনুন আপনি পারবেন এবং সর্বোপরি সৎ থেকে নিজেকে ভরসা করতে শিখুন। মনে মনে আত্মবিশ্বাস আনুন। নিজের প্রতি আস্থা জন্মালেই আপনি পর্ণ আসক্তি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাবেন।
১২. আপনার নীরবতা কাম্য নয়ঃ
সবসময় নীরব থাকলেও কিছু পরিস্থিতিতে স্বরব হওয়া প্রয়োজন। আপনার অন্ধকারের নীরবতা ভেঙে বেরিয়ে আসুন আলোর ভুবনে। আর কতদিন নিজেকে আড়াল করে গুমরে মরবেন। অন্ধকারের কান্না কেউ শোনে না। চার দেওয়াল ভেদ করে তা অন্য কারো কানে পৌঁছায় না। তাই এখনই সময় স্বরব হওয়ার।
১৩. শরীরচর্চা করুনঃ
পর্ণ আসক্তি থেকে বের হয়ে আসার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা জরুরি। পর্ন আসক্তির ফলে মানুষ যে শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হয় সেগুলোর কিছু কিছু রোগ নিরাময়ে শরীরচর্চা জরুরি। হাঁটুন, দৌঁড়ান, সাঁতার কাটুন, সাইকেল চালান, ব্যায়াম করুন, মোটকথা নিজেকে ফিট রাখুন। তবে শরীরের সাথে মনকে প্রশমিত করতে শরীরচর্চার পাশাপাশি নিয়মিত মেডিটেশন করুন। এতে মানসিকভাবে আপনি আগের চেয়ে অনেক বেশি উৎফুল্ল থাকবেন।
১৪. প্রকৃতির সান্নিধ্যে যানঃ
মাঝেমধ্যে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যান। ঘুরে আসুন যেখানে মন চায়। নরম ঘাসে খালি পায়ে হাঁটুন, শিশির ভেজা ভোর দেখুন, বৃষ্টিতে ভিজুন, নীল আকাশ দেখুন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলে মন খারাপ থাকে না।
১৫. খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করুনঃ
যেসব বন্ধুরা আপনাকে পর্ণ সরবারাহ করে বা পর্ণ দেখতে প্ররোচিত করে তাদের থেকে দূরে থাকুন। শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
আবার যে মানুষগুলো আপনার এই অবস্থার কথা জেনেও আপনাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে তাদের থেকেও দূরে থাকুন। এরা আপনাকে সাহায্য করার বদলে আপনাকে সমস্যায় ফেলবে।
১৬. নিয়মিত ধর্মচর্চা করুনঃ
যারা পর্ণ আসক্ত বা আসক্তি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন তাদের অবশ্যই নিয়মিত ধর্মচচা করা উচিত। মুসলিম হলে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করুন, রোজা রাখুন, কোরআন তেলোয়াত করুন, পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন আল্লাহর কাছে। অন্য ধর্মাবলম্বীরা স্রষ্টার নিকট প্রার্থনা করুন, ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করুন। নিয়মিত ধর্মচর্চার মাধ্যমে আপনি অবশ্যই মুক্তির উপায় খুঁজে পাবেন।