পর্নোগ্রাফি আসক্তি থেকে বাঁচার উপায়ঃ ( পর্ব ২)



পর্ণ আসক্তির লক্ষণঃ

আপনি পর্ন আসক্ত কিনা সেটির বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে। অর্থাৎ যার মাধ্যমে বোঝা যায় কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফির শিকার হয়েছে কিনা। যদি আপনার মধ্যেও এসব লক্ষণ বিদ্যমান থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি পর্ণে আসক্ত।
 
চলুন জেনে নেওয়া যাক পর্ণ আসক্তির লক্ষণসমূহ:

পর্ণ আসক্ত ব্যক্তি সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিবার সকলের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়।
নিজের কাজ ফেলে রেখে অধিক সময় পর্ণ দেখে নষ্ট করে।
নিজের সময় ও কাজ থেকে পর্ণ দেখাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে পর্নোগ্রাফিকে বেছে নেয়।
পর্ন আসক্ত ব্যক্তি নিজেও বোঝে পর্ন দেখা ঠিক নয় তবুও সে বারবার একই ভুল করে থাকে কারণ সে অভ্যাসের স্বীকার।
স্বাভাবিক যৌন জীবনের ছন্দপতন ঘটে।
অভ্যাসে পরিণত হলে তখন নিয়মিত পর্ন না দেখলে কোনো কিছুই ভালো লাগে না।
প্রথমে অল্প সময় ও পরে আপনি পর্ণ দেখায় অধিক সময় ব্যয় করবেন।
পর্ণ ভিডিও দেখার ডিভাইসটি সকলের থেকে লুকিয়ে রাখা।
নিজেকে একা ঘরে বন্ধ করে পর্ণ দেখা।
নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে।
নিয়মিত পর্ণ সাইট ভিজিট, ছবি ও ভিডিও দেখা।
ব্যবহৃত ডিভাইসের হিস্ট্রি মুছে ফেলা, পাসওয়ার্ড পাল্টে ফেলা।
ওয়াশরুমে মাঝেমধ্যে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ করা।
শিশুদের মধ্যে পর্ন দেখার প্রবণতা ও এর থেকে বের হবার উপায়
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে বর্তমানে ইন্টারনেটের ব্যবহার সহজলভ্য হয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট যেমন একটি আশীর্বাদের নাম ঠিক তেমনি ইন্টারনেট ব্যবহার করেই অনেক শিশু-কিশোর আসক্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও পর্ণ দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে যেসকল বাসা-বাড়িতে শিশুরা একা থাকে, বাবা-মা উভয়ই চাকুরিজীবী, মা-বাবার সাথে যেসব শিশুদের সম্পর্ক খারাপ তাদের মধ্যেই মূলত পর্ণ আসক্তি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া পর্ণ আসক্তদের একটি বড় অংশ হলো স্কুলগামী ছেলে-মেয়ে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলগামী ছেলেদের ৬১.৬৫ শতাংশ পর্ন দেখে ও ৫০.৭৫ শতাংশ ছেলে ইন্টারনেটে পর্ন খোঁজে।

“মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন” পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে রাজধানীর ৭৭ শতাংশ কিশোর পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত।

পর্ণ আসক্ত একটি শিশু মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে, অধিক পর্ণ দেখার প্রবণতা একটি শিশুর ভবিষ্যতকে ধ্বংস দিকে ঠেলে দিতে পারে।

যখন আপনার নিষ্পাপ শিশুটি ধীরে ধীরে পর্ণ আসক্ত হয়ে পড়বে তার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। অনেক বাবা-মা এটি বুঝতে পারেন অনেকেই আবার পারেন না। এতে করে শিশুটির সুন্দর শৈশব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বাবা-মাকে সবসময় সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে৷ সন্তানের পর্ণ দেখার প্রবণতা সন্তানের ধ্বংসের কারণ।

যেসব লক্ষণ দেখলে বুঝবেন আপনার সন্তানের মধ্যে পর্ন দেখার প্রবণতা রয়েছে:

  • ~চঞ্চল শিশুটি যখন চুপ হয়ে যায়।
  • বাবা-মায়ের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

  • ~সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখার প্রবণতা।
  • ~মোবাইল বা ডিভাইস কাঁথা বা কম্বলের নিচে লুকিয়ে ব্যবহার করবে ও রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করবে।
  • ~বন্ধুদের সাথে খেলতে না চাওয়া ও খেলার প্রতি অমনোযোগী হওয়া।
  • নিজেকে ঘরে বন্দী করে রাখা। ~আপনি হুট করে ঘরে ঢুকলেই সে চমকে যাবে ও তার মধ্যে অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা যাবে।
  • ~পড়াশুনায় অমনোযোগী।
  • ~মেজাজ খিটখেটে হয়ে যাওয়া।
  • ~আগের চেয়ে ওয়াশরুমে দীর্ঘসময় কাটানো ও ফোন নিয়ে যাওয়া।
  • শিশুদের রাত জাগার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া।
  • ~কেউ ঘরে ঢুকলেই ফোন-ল্যাপটপটি বন্ধ করে দেওয়া ও আতঙ্কিত হয়ে পড়া।
২০১২ সালের একটি জরিপে দেখা গিয়েছে ৮২% ছেলেমেয়েরা সুযোগ পেলেই মোবাইলে পর্ন দেখে।
কম্পিউটার বা ল্যাপটপের স্ক্রিন এমনভাবে ঘুরিয়ে রাখবে যেনো বাহিরের কেউ তা দেখতে না পারে।
স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা পর্নে এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছে যে তারা ক্লাসেও পর্নোগ্রাফি দেখা শুরু করেছে।
বাংলাদেশের একটি জরিপে দেখা যায় ৬২% শিক্ষার্থী ক্লাসে বসেই পর্ণ দেখে”।


শিশুদের মধ্যে পর্ণোগ্রাফির প্রবণতা বেড়ে গেলে তা থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসা জরুরি। নয়তো তার সুন্দর ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়বে। এজন্য বাবা-মাকে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। যেমন:

পর্নোগ্রাফি শিশুদের উন্নয়নে একটি বড় বাঁধা। অল্প বয়সে নারী-পুরুষের দেহের রসায়ন বুঝে ফেলায় তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ কাজ করে। একাকিত্ত্বের কারণে শৈশব ম্লান হয়ে কৈশোরে মাদক পিছু নেয় আর যৌবনে পা বাড়ায় আত্মহননের দিকে। তাই প্রত্যেক পিতা-মাতার উচিত তার সন্তান কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মেলামেশা করছে সে বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখা ও সজাগ থাকা।
বাবা-মাকে অবশ্যই সন্তানের জন্য আলাদা সময় বের করতে হবে। সন্তানের সাথে কোয়ালিটিফুল সময় কাটান।

বাবা-মায়ের সাথে একটি শিশু যেনো সব কথা শেয়ার করতে পারে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এমনভাবে আপনার সন্তানের সাথে মিশুন যেনো তার আস্থা অর্জন করতে পারেন।
শিশুদের সাথে গল্প করুন, সময় দিন, সর্বোপরি তাদেরকে প্রাধান্য দিন।
শিশুর মোবাইল, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন থাকুন। বর্তমান যুগে এসকল উপকরণ শিশুর লেখাপড়ার অংশ হয়ে যাচ্ছে তবুও নির্দিষ্ট সময়ে এগুলোর ব্যবহার বাদে বাকি সময় এসব ডিভাইস দূরে রাখুন।

আপনার শিশু একা বদ্ধ ঘরে ডিভাইস ব্যবহার করলে তাদের দিকে খেয়াল রাখুন ও নিরুৎসাহিত করুন।
ছোট থেকেই পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ সম্পর্কে শিশুকে সজাগ করুন এবং ছোট ছোট দায়িত্ব তাকে দিন।

শিশুকে পারিবারিক ও নৈতিকতা সম্পর্কে শিক্ষা দিন
আপনার সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দিন।
আপনার সন্তানকে সঠিক যৌনশিক্ষা দিন। মূলত সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত যৌনজ্ঞান না থাকার কারণেই পর্ন আসক্তি জন্মে। তবে এ বিষয়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
আপনার সন্তান পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে গেলে তাকে বকাবকি না করে বুঝিয়ে বলুন, তার অন্ধকারের গল্পগুলো শুনুন, তাকে লজ্জা বা তিরষ্কার না করে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিন। প্রয়োজনে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন৷
 
পর্নোগ্রাফি আসক্তির ক্ষতিকর দিক

অধিক পর্নোগ্রাফি আসক্ত মানুষ তার জীবনসঙ্গীর সাথে পর্ণ অভিনয় শিল্পীর পার্থক্য করতে পারেন না ফলে সে পর্ন শিল্পীর মতোই তার জীবনসঙ্গীকে কল্পনা করেন। এতে তার বৈবাহিক জীবনে অশান্তি হয়।
দীর্ঘদিন ধরে পর্ন আসক্ত ব্যক্তির বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। শরীরে টেস্টোস্টোরোনের (Testosterone) পরিমাণ কমে যায়, এর ফলে ক্লান্তি ভাব, বিষন্নতা, দুর্বল স্মৃতিশক্তি, মেরুদন্ডে ব্যথা, মনোযোগ কমে যাওয়া, চুলপড়া, চর্বি জমা, হাড় ক্ষয়, স্বাভাবিক যৌনক্রিয়াতে অনীহা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, কম শারীরিক সক্ষমতা, পুরুষালি আচরণ কমে যাওয়া প্রভৃতি দেখা দেয়।

পর্ণে আসক্ত ব্যক্তির জীবনসঙ্গীর উপর প্রত্যাশা বেড়ে যায়। বাস্তবতা ছবির মতো নয় এটি সে ভুলে যায়।
এটি এমন একটি আসক্তি যা লুকানো সহজ নয়। কারো না কারো সামনে চলে আসে ফলে আসক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব হ্রাস পায়।

দীর্ঘদিনের পর্ন আসক্তি মানুষকে মস্তিষ্কের সাধারণ চিন্তা করার ক্ষমতাকে বাঁধাগ্রস্ত করে যা মানুষকে ধীরে ধীরে পর্ণে আরও আসক্ত করে।
পর্ণ নেশার মতো। শুধুমাত্র মাদকের সাথে এর তুলনা নয়, এর তুলনা করা হয় কোকেইন, হিরোইনের সাথে। কোকেইন, হিরোইন সেবনে যেমন মস্তিষ্কের গঠন বদলে যায় সেরূপ বদলায় পর্ণ দেখলে। পর্ণ এমন একটি নেশার নাম যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করে।
পর্ণ মানুষকে এতটায় আসক্ত করে যে সে এই নেশা ছাড়তে পারে না। এটি ব্যক্তির মস্তিষ্ককে ভালোভাবে প্রভাবিত করে ফলস্বরূপ সে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ব্যক্তি একটা সময় পর ডিপ্রেশনে ভোগে যা কাটিয়ে ওঠা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়।
অধিক আসক্তির ফলে ইন্টারনেটে অর্থ খরচ করে পর্ণ দেখা শুরু করে ফলে অর্থের অপচয় হয় ও আর্থিকভাবে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফটোকপি, মোবাইল ফোনে গান বা রিংটোন ভরে দেওয়ার দোকানগুলোতে দৈনিক বিক্রি হচ্ছে ২.৫ কোটি টাকার পর্ন।
শুরুর দিকে অনেকেই মাদকের সাথে পর্ণ দেখা শুরু করে। প্রথমদিকে এটি তার কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও একসময় তা আসক্তিতে পরিণত হয়।
 
পর্ণ আসক্ত ব্যক্তিরা সকল ফোকাস পর্ণ দেখায় দিয়ে থাকেন এজন্য তারা অন্য কাজে ফোকাস ধরে রাখতে পারেন না।
জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হন।
পর্ন আসক্তির সাথে নারী নির্যাতনের সরাসরি যোগসূত্র আছে যা বহু গবেষণায় প্রমাণিত। পর্ন আসক্তি নারীদের প্রতি সহিংসতাকে তীব্রভাবে উৎসাহিত করে।
জীবনের প্রতি একসময় অনীহা জন্মে, নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা বোধ কাজ করে ফলে একটা সময় পর সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
Rahmanblog

Hey there! My name is Abdur Rahman, I am a Professional Web Designer, Graphic Designer. I am Content Creator from Sylhet , Bangladesh. I love coding and editing, so I always try to create something new and interesting.

Post a Comment

Previous Post Next Post