আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন এর কর্মপন্থা হলো, একেক বছর একেক এলাকায় স্বাবলম্বী প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা। শুরুতে সেই এলাকার নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করা হয়। তারপর তাদের হাতে তাদের চাহিদা অনুসারে স্বাবলম্বী উপকরণ তুলে দেওয়া হয়।


 আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, লাইসাল খাবারু কাল মুআয়ানাহ' অর্থাৎ, শোনা জিনিস কখনো দেখার মত হয় না। তাই আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন নিয়ে কোন শোনা কথা নয়; বরং আমার নিজের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। যাতে করে বুঝতে পারেন, কেন আমি আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনকে বিশ্বাস করি। 


আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন এর কর্মপন্থা হলো, একেক বছর একেক এলাকায় স্বাবলম্বী প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা। শুরুতে সেই এলাকার নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করা হয়। তারপর তাদের হাতে তাদের চাহিদা অনুসারে স্বাবলম্বী উপকরণ তুলে দেওয়া হয়। 

করোনা-পরবর্তী সময়ে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা সম্মাননার আয়োজন করে। কারণ করোনার সময়টাতে দেশে তরুণ-যুবকদের নতুন অনেক উদ্যোগের জন্ম হয়েছিল। সেখানে আমি ও আমাদের অনলাইন একাডেমী (Nurul Quran Academy, বিস্তারিত জানতে দেখুন- www.nlquran. com) সম্মাননার জন্য নির্বাচিত হয়। সেই উপলক্ষে ফাউন্ডেশনের কাছে আমি পরিচিত ছিলাম। 
 
পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে গত বছর আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন আমাকে কয়েকজন যাকাতের উপযুক্ত দরিদ্র ব্যক্তিকে খুঁজে দেওয়ার কথা বলল। যাদেরকে স্বাবলম্বী প্রজেক্ট থেকে রিকশা, ভ্যান, সেলাই মেশিন বা এজাতীয় স্বাবলম্বী উপকরণ কিনে দেওয়া হবে। এবং এই কাজটা আমাকে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে করে দিতে হবে। এমন না যে, এই পরিশ্রমটুকুর জন্য আমাকে কোন কিছু দেওয়া হবে। পুরোপুরি নিঃস্বার্থ কাজ ছিল সেটি। 

আমি তখন যাত্রাবাড়ী কুতুবখালী এলাকায় থাকতাম। এলাকার জানাশোনা কয়েকজনের সহায়তায় কিছু দরিদ্র মানুষকে প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত করলাম। তারপর আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে পাঠানো নির্ধারিত ফর্ম এর পেছনে লেখা শর্তগুলো তাদেরকে বিস্তারিত আকারে পড়ে শুনালাম। এরপর তাদের নাম ঠিকানা ইত্যাদি ফর্মে লিপিবদ্ধ করে আপডেট জানালাম। মোটামুটি সকলেই রিকশা নেওয়ার কথা বলল। যদিও শুরুতে দুই এক জন ভ্যান নেওয়ার কথা বলেছিল; কিন্তু পরে তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। 

আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন সরাসরি টাকা না দিয়ে জিনিস দেওয়ার পন্থা অবলম্বন করে। কেননা দেখা যায়, নগদ টাকা দেওয়া হলে দরিদ্র মানুষেরা সেটা অন্যখাতে খরচ করে পুনরায় মানুষের কাছে হাত পাতে।রিকশা যেহেতু বানিয়ে নিতে হয় তাই আমার কাছে টাকা দিয়ে বলা হয়, প্রত্যেকটি খরচের আলাদা রশিদ যেন রাখা হয়। সবকিছু আমরা এক গ্যারেজের লোককে দিয়ে তৈরি করাই। রিকশা সাধারণত খুচরা যন্ত্রাংশ কিনে তারপর বানিয়ে নিতে হয়। 

রিকশাগুলো তৈরি হবার পর নির্ধারিত দিনে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি আসেন এবং তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদেরকে সেগুলো নিজ হাতে তুলে দেন। তাদেরকে রিকশাগুলো দেওয়ার ছবিসহ অন্যান্য ডকুমেন্টসও সংগ্রহ করে নেন আমাদের থেকে। প্রত্যেকটা রিকশার পিছনে যে খরচ হয়েছে আমরা সবগুলোর ভাউচার দিতে পারলেও শুধুমাত্র একটি পার্টস এর ভাউচার ছিল না। কেননা সেটি যেই দোকান থেকে কেনা হয় তাদের আলাদা কোন ভাউচার বই ছিল না। খুব সামান্য টাকার একটা ব্যাপার ছিল। অনেক বড় অংকের কোন টাকা নয়। তারপরও সেটা ভাউচার ছাড়াই অথবা অন্য ভাউচারের মধ্যে একে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো না। বরং রিকশাগুলো পাওনাদারদেরকে বুঝিয়ে দিয়ে ফাউন্ডেশন এর সেই প্রতিনিধি গ্যারেজমিস্ত্রিকে সাথে করে রওনা হন নবাবপুরের দিকে। যাতে করে যেই দোকান থেকে কেনা হয়েছে তা যাচাই এবং ভাউচার সংগ্রহ করে নিতে পারেন। যেন পুরো লেনদেনে বিন্দুমাত্র ফাঁক না থাকে। বরং প্রতিটি ব্যয়ের ডকুমেন্টস থাকে। যখন তিনি রওনা হচ্ছিলেন তখন তাদের অর্থ ব্যয়ের এবং যাচাই-বাছাই এর এই সূক্ষ্মনীতি এবং আন্তরিকতা খুবই ভালো লেগেছিল এবং বুঝেছিলাম যে তারা অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করে। যেন কোনভাবেই টাকা এদিক সেদিক তছরুপ হতে না পারে। 

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন যে স্বাবলম্বী উপকরণ প্রদান করবে, শর্ত থাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া অব্দি সেটার সাথে গ্রহীতা নিজের পক্ষ থেকে কিছু যুক্ত করতে পারবে না। যেমন ধরেন উদাহরণত, তাদের বাজেট হলো জনপ্রতি ৩০ হাজার। এখন একজন এমন দামি পার্টস দিয়ে মজবুত রিকশা বানাতে চাচ্ছে যেটার জন্য হয়ত লাগবে ৩৫ হাজার টাকা। সে যদি চায় আমি আপনাদের দেওয়া টাকার সাথে নিজ থেকে ৫ হাজার টাকা এড করে ৩৫ হাজার দিয়ে জিনিসটা বানিয়ে নিব, তারা রাজি হবে না। কেননা এতে কখনো এমন দাবী তোলার সুযোগ থাকে, স্বাবলম্বী উপকরণ আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন পুরোপুরি দেয়নি। আংশিক আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন দিয়েছে আর আংশিক গ্রহীতা নিজের পকেট থেকে দিয়েছে। হ্যাঁ, কেউ চাইলে জিনিস হাতে পাবার পর নিজের মত যা খুশি এতে বাড়াতে/ যুক্ত করতে পারে। এই ব্যাপারটিও সতর্কতামূলক লেগেছে।

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন সাধারণত প্রজেক্টভিত্তিক কাজ করে। যেখানে দানগ্রহীতা এর সকল তথ্য বিবরণী তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকে। ব্যক্তিগতভাবে ফাউন্ডেশন থেকে সাহায্য করা হয় না। যেহেতু এতে করে স্বজনপ্রীতি বা এই ধরনের অভিযোগ তোলার একটা সুযোগ থেকে যায়। ধরেন কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিজের সমস্যার জন্য অনুদান চাইল, এতে কাজ হবে না। এই ব্যাপারটি জানতে পেরেছিলাম যখন আমি আমার এক ওস্তাদের জন্য ব্যক্তিগত সাহায্যের আবেদন করেছিলাম। তখন এর চেয়ারম্যান শাইখ আহমদুল্লাহ সাহেব ব্যাপারটি আমাকে খুলে বলেন এবং নিজের অপারগতা প্রকাশ করেন। এবং ফাউন্ডেশন কেন এই নীতি অবলম্বন করেন সেটাও তিনি বুঝিয়ে বলেন। 

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন তাদের নীতিমালায় রেখেছে, চেয়ারম্যান যিনি হবেন তিনি এর থেকে কোন বেতন-ভাতা নিতে পারবেন না। সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটিও করা হয়েছে যেন কোন রকম অভিযোগের সুযোগ না থাকে। এই ব্যাপারটিও আমাকে মুগ্ধ করেছে। 

স্বাবলম্বী প্রজেক্ট সাধারণত যাকাতের খাত থেকে বাস্তবায়ন করা হয়। এর জন্য দানগ্রহীতার সকল তথ্য ভাল মত যাচাই করে নেওয়া হয় যেন যাকাতের অর্থ যাকাতের খাটেই সঠিকভাবে ব্যয় হয়। আর সাধারণ দানের খাত থেকে সাধারণ সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালন করা হয়। যেখানে অমুসলিমরাও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। গতবার সিলেটের বন্যায় মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর হিন্দু পরিবার আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে ত্রাণ পেয়েছে। মানে ব্যাপারটা মোটেও এমন নয় যে, এই ফাউন্ডেশনের নাম 'আস-সুন্নাহ' হওয়ায় এটি শুধুই মুসলিমদের সহায়তা করে।কিন্তু এটা করতে গিয়ে তারা আবার শরীয়তের সীমারেখাকেও লঙ্ঘন করে না যে, যাকাতের টাকাও অমুসলিমকে দেয় বা যাকাতের টাকয় রাস্তাঘাট বানায়, কল স্থাপনে করে।  

যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হচ্ছে প্রথমে নিজের গরিব-দুঃখী আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া অথবা নিকটস্থ মাদ্রাসার গোরাবা ফান্ড থাকলে সেখানে দেওয়া। নিজের কাছাকাছি ও আপনজনরাই যাকাতের সবচেয়ে বড় হকদার। কিন্তু যদি কেউ যাকাতের পরিমাণ বড় হওয়ার কারণে বিতরণের ঝামেলায এড়াতে চান অথবা তিনি এমনটা সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেন যে, কোন না কোন দাতব্য সংস্থাকে দান করে দিবেন, সেক্ষেত্রে বিদ্যানন্দের মতো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনকে আমি সাজেস্ট করি। এর কারণ হলো, যাকাত ইসলামের একটি খালেস ইবাদত, যা সঠিকভাবে সঠিক খাতে আদায় করতে হয়। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন খুবই সতর্কতার সাথে তা করে থাকে। যেটা আমি চাক্ষুষ অবগত।

তাছাড়া তারা শুধু সেবাই নয়, পাশাপাশি দাওয়াহ এর কাজও করে। যেমন, যে স্বাবলম্বী প্রজেক্টে আমি ছিলাম সেখানে স্বাবলম্বী উপকরণ দানগ্রহীতাদের হাতে তুলে দেওয়ার আগে শর্ত ছিল একমাস তাদেরকে একটি কোর্স করতে হবে। সেখানে দ্বীনের প্রয়োজনীয় আকিদা-মাসায়েল ইত্যাদি তাদেরকে শেখানো হবে। এর জন্য আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন এর আলাদা একটি বইও আছে। নাম হলো- কর্মজীবীদের জন্য দীনি শিক্ষা কোর্স। শুধু দুনিয়াবী বিষয় নয়; বরং মানুষের আখিরাতের ব্যাপারটির প্রতিও লক্ষ্য রাখে তারা। উল্লেখ্য যে, এই বইটি সাধারণ মানুষের জন্য আমরা আমাদের নুরুল কুরআন একাডেমী থেকে ফ্রি কোর্স হিসবে খুব শীঘ্রই নিয়ে আসব ইনশাআল্লাহ। আমাদের দিক থেকে প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছি, শুধু অনুমোদনের অপেক্ষা।  

শেষ করার আগে আরেকটি বিষয় ক্লিয়ার করে দেই। আমি আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন এর কোন লোক না। চাক্ষুষ তাদেরকে যেমন দেখেছি সেটাই শুধু তুলে ধরার চেষ্টা করেছি সম্পূর্ণ স্বপ্রণোদিত হয়ে। যাতে করে ভাল কাজ ও ভল মানুষের পক্ষে সাক্ষী হয়ে থাকে এগুলো। আল্লাহ সকলকে বুঝার তাওফিক দিন, আমিন। 

লেখাটি উপকারী মনে হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। 

@ Abdullah Al Masud

Post a Comment

Previous Post Next Post