রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের পরবর্তী যুগে ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল ‘আইন জালুতের যু/দ্ধ'।


 রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের পরবর্তী যুগে ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল ‘আইন জালুতের যু/দ্ধ'।


এই বিজয় অর্জিত হয়েছিল বরকতপূর্ণ রামাদানে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকের সমাজের অনেক মুসলিমই, বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তাে তাৎপর্যপূর্ণ এ বিজয়ের কথা জানে না, আর জানে না বলে তারা এ বিজয়ে গর্ববােধও করে না।

সেই সময়ের মুসলিম উম্মাহর একজন প্রথম সারির ইতিহাসবেত্তা ইবনু আসির রাহিঃ এর মতে– আদম (আঃ) -এর সময় থেকে শুরু করে এর চাইতে ভয়ানক হত্য|যজ্ঞ আর সংঘটিত হয়নি। এটা কোনাে অতিরঞ্জন নয়। নৃশংসতার বিচারে কাছাকাছি যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা হলাে ঈসা (আঃ) এর ৫৬৩ বছর আগে বুখতানাসার কর্তৃক সংঘটিত বায়তুল মুকাদ্দাসে বনি ইসর|ইলিদের ওপর হত্য|যজ্ঞ।

কতটা ভয়াবহ ছিল সেই সময়? একটি কাহিনি শুনলেই আমরা সেটা বুঝতে পারব। ইবনু আসির বলেছেন–

একবার তাতারদের এক মহিলা কোনাে বাড়িতে ঢুকেছিল। সে বাড়িতে অনেক পুরুষ, মহিলা এবং বাচ্চারা ছিল। সেই তাতার মহিলা একে একে সবগুলাে পুরুষ, মহিলা আর বাচ্চাদেরকে হত্য| করল, কিন্তু এদের মধ্যে একজনও আত্মরক্ষার কথা ভাবলই না! বাঁচার কোনাে চেষ্টাই করল না! এমনই ছিল অবস্থা। কারণ তারা ছিল পরাজিত মানসিকতার মুসলিম। তারা আগেই হার মেনে নিয়েছিল, তারা ছিল দাসভাবাপন্ন মুসলিম।

এমন আরাে একটি কাহিনি তিনি বর্ণনা করেন। মুরাঘাহ নামক একটি জায়গায় তাতারদের এক লােক প্রবেশ করে, সেখানে ছিল ১০০ পুরুষ। ১০০ পুরুষের প্রত্যেককে সে একে একে হত্য| করে। তাদের মধ্যে একজনও প্রতিরােধ করার চেষ্টা করেনি, একজনও তার ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

৬৫৪ হিজরির পর অবস্থা আরাে অবনতির দিকে গেল যখন তাতাররা রােমান ভূখণ্ড দখল করল। তাদের নেতা হলাে চেঙ্গিস খানের পুত্র হালাকু খান। সে বাগদাদ আক্রমণ করল হিজরি ৬৫৬ সালে এবং সেখানে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্য|গুলাের একটি সংঘটিত হয়।

খু/ন, রাহাজানি, লুটপাট, ধর্ষণ তাে আছেই— এই আক্রমণের মাধ্যমে আব্বাসী খিলাফাতকেও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়! তারা চেয়েছিল ইসলামি সভ্যতাকে সম্পূর্ণরূপে ধূলােয় মিশিয়ে দিতে। তারা সেখানে খলিফা মুস্তাসিম, তার পরিবার-পরিজন ও সহযােগীদের হত্য| করে। মাত্র ১২ দিনের মধ্যে সে বাগদাদের বিশ লক্ষ মুসলিমকে হত্য| করে! মুসলিম ও ইসলামের সামান্য ছায়াটুকুও হালাকু খান সহ্য করত না। ইসলামের ইতিহাসে সে ছিল ইসলামের নিকৃষ্টতম শত্রুদের একজন।

মুসলিম জাতির সেই গভীর কালো রাত্রিতে উত্থান ঘটে এক সাহসী বীরের যার নাম আল মালিক আল মুজাফফর সাইফুদ্দীন কুতুয। তিনি হিজরি ৬৫৭ সালে ক্ষমতা গ্রহন করেন, সেই সময় তাতাররা সীমালঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছিল। তিনি এমন এক সময়ে শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন যখন মিশর তাতার আক্রমণের ঝুঁকিতে। উম্মতের মর্যাদা ও বিজয় ফিরিয়ে আনতে তিনি শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিলেন।

৬৫৮ হিজরীর রামাদানের ১৫ তম দিনে, আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে যু-দ্ধের দামামা বেজে ওঠে, তলোয়ারের ঝনঝনানি চারদিকে প্রতিবনিত হতে শুরু করে।

আল্লাহর সাথীদের ‘আল্লাহু আকবার' ধ্বনি প্ৰবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। যু/দ্ধরত সৈন্যরা এবং আশেপাশের উপত্যকায় বসবাসরত মানুষ যারা সরাসরি যু/দ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, সবাই আল্লাহু আকবার' ধ্বনিতে সরব হয়ে ওঠে।

মুসলিম সৈন্যরা তাতারদের বৃহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাতারদের একের পর এক ল|শ পড়তে থাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলিমদের জন্য পরিস্থিতি অনুকূল হয়ে ওঠে আর শত্রুদের জন্য ময়দান যেন জাহান্নামের মতাে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শুরুতে এটা ছিল মুসলিমদের জন্য আশ্চর্যজনক বিজয়, কিন্তু, এক পর্যায়ে মুসলিমরা একটু পিছিয়ে পড়ে। মুসলিমদের এই অবস্থা দেখে সেনাপ্রধান কুতুয তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, নিজের হেলমেট খুলে ফেললেন আর বলে উঠলেন–

“ওয়া ইসলামাহ! ওয়া ইসলামাহ! ওয়া  ইসলামাহ।”

ইসলাম তখন বিপন্ন! কুতু্য থামলেন না, না এগিয়ে গেলেন শত্রুবাহিনীর দিকে। নিজেদের নেতাকে হেলমেটবিহীন অবস্থায় শত্রুসেনাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে মুসলিম বাহিনী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের নেতাকে অনুসরণ করা শুরু করল। সম্মিলিত আঘাতের এক ঝড় হাওয়া বইতে শুরু করল। তাতারদের জেনারেল নিহত হলাে, শত্রুপক্ষের সমগ্র সৈন্যবাহিনী তছনছ হয়ে গেল, এবং মুসলিমরা তাদের পিছু ধাওয়া করল। কেউ কেউ মারা পড়ল আর অনেককেই গ্রেফতার করা হলাে। মুসলিমদের এই অত্যাশ্চর্যজনক বিজয় তাতারদেরকে তাদের মৃত্যুকূপে পৌঁছে দেয়।

আইনে জালুত ইতিহাসের বৃহত্তম ও তাৎপর্যমন্ডিত যু/দ্ধ এবং ঐতিহাসিক বিজয়গুলাের মধ্যে অন্যতম।

কেন?

কারণ মুসলিমরা যদি ঐ সময়ে মঙ্গোলদের বিস্তারকে প্রতিরােধ না করত, তাতাররা মিশর দখল করে ফেলত, আর মিশরই ছিল সে সময়ের ইসলামের শেষ দৃর্গ। আফগানিস্তান, ইরাক, শাম—সবই মুসলিমরা হারিয়েছে।

কুতুয যদি সেই সময়ে আইন জালতে তাঁর সাহস আর পরাক্রম নিয়ে তাদের গতি রােধ না করতেন, তাতাররা মিশরের মুসলিমদের উপরও গণহত্য| চালাত। তারপর তারা আফ্রিকা এবং ইউরােপের অন্যান্য অংশে অগ্রসর হতো, এটাই ছিল ওদের পরিকল্পনা। প্রায় অর্ধশত বছর পর্যন্ত মুসলিমরা তাদের সাথে কোনাে একটা যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি, বরং বলতে গেলে তেমন কেউই তাদের সামনে মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। 

যাইহোক, সবশেষে আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি যেন তিনি এই উম্মাহর কষ্ট লাঘব করে দেন। তিনি যেন আমাদের প্রিয় নেতা সাইফুদ্দীন কুতুয রাহিঃ এর মতো নেতা দিয়ে প্রতারকদের স্থলাভিষিক্ত করেন।

---------------------

-‘ধূলিমলিন উপহার রমাদান’ বই হতে সংক্ষিপ্ত আকারে লেখাগুলো নেওয়া হয়েছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post