আমরা সকলেই পাকিস্তানের জুনায়েদ জামশেদ রহিমাহুল্লাহর কথা শুনে থাকব। নিজের জবানবন্দিতে উনি উল্লেখ করেছিলেনঃ একজন যুবক তার জীবদ্দশায় যা কিছুর কল্পনা করতে পারে যা তার কাছে থাকা উচিত তার সব আমার কাছে ছিল। তবুও আমি অখুশি ছিলাম, অন্তর থেকে খালি ছিলাম। কিছু একটার কমতি ছিল আমার জীবনে। এই কথাগুলো উনি মাওলানা তারিক জামিলের সাথে প্রথম সাক্ষাতে বলেছিলেন, তখন মাওলানা হুজুর বলেছিলেনঃ তোমার ব্যথা হচ্ছে হাতে কিন্তু তুমি মলম লাগাচ্ছ হাটুতে। আমরা দুইটা মৌলিক জিনিসের সমন্বয়ে গঠিত। এক হচ্ছে রুহ, আরেকটি হচ্ছে দেহ। দেহের যা প্রয়োজন তা তো দুনিয়াবি কিন্তু এই রুহের যা প্রয়োজন তা হচ্ছে উপরে। এই রুহের আল্লাহকে প্রয়োজন। এই রুহ, আত্মা শান্তি, সুখ খুজে পায় আল্লাহমুখী হওয়ার মাধ্যমে।
শান্তি, সুখ আমাদের ক্বলবের সাথে জড়িত বিষয়। তাই এটার প্রকৃত হাকিকত বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই আল্লাহর, নিজের রবের আদেশ-নিষেধগুলো মেনে জীবন চালাতে হবে। রবের বন্দেগীর মধ্যে যে শান্তি-সুখ পাওয়া যাবে তা দুনিয়ার অন্য কোন কাজে পাওয়া অসম্ভব কেননা আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন —
أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ
জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই দিলের সত্যিকারের প্রশান্তি লাভ করা যায়। (১৩:২৮)
উপরের প্রশান্তি লাভের এই বিষয়টি নারী-পুরুষ সকলের বেলায়ই প্রযোজ্য।
এবার আসি স্পেসিফিকভাবে পুরুষদের বেলায় জীবন সংগ্রামের পথে কীভাবে শান্তি পাওয়া যায় এই আলোচনায়...
ছোটবেলায় পড়াশোনার জন্যে প্যারা খাওয়া ব্যাপারটা ধরে নিলাম কোন বাবা-মা তার ছেলের জন্যে প্রযোজ্য করলোনা, তাকে স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছেয় ছেড়ে দিলো, সে কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে এই বিষয়টি অনুভব করবে যে: আমি তো ছোট ছিলাম। নিজের ভালোমন্দ বুঝার মতো আক্বল/বুদ্ধি ছিলনা। কিন্তু আমার বাবা-মা কেন আমাকে তখন বুঝালোনা, আমি যে পদে পদে অবহেলা, অলসতায় সময় কাটিয়ে নিজের জীবনকে এভাবে বরবাদ করলাম, তারা কেন আমাকে বুঝালোনা। এই বিষয়টা বুঝলেই প্যারা শব্দটার আসলে অস্তিত্ব থাকেনা। বয়সের সাথে সাথে ম্যাচুরিটি যখন আসে তখন আসলে বুঝা যায়, পৃথিবীর কোন শিক্ষিত-সচেতন বাবা-মাই তার সন্তানের খারাপ চায়না, তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখতে চায়, আত্মনির্ভরশীল হয়ে বাচতে দেখতে চায়, পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে দেখতে চায়। তাই ছোট থেকেই জীবনের ম্যাচুরিটি/নিজের ভাল মন্দ বিচারের সময় পর্যন্ত সন্তানদের বাবা-মার কথা মোতাবেক চলা উচিত। তবে হ্যা বাবা-মা যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতার আদেশ দিবে, দ্বীনের বুঝে আসলে সে ব্যাপারগুলো বিচক্ষণতা ও আদবের সাথে ম্যানেজ করতে হবে।
ইমাম শাফেঈ রহিমাহুল্লাহর উক্তি হচ্ছেঃ সময় হচ্ছে দুই ধারওয়ালা তলোয়ারের মতো৷ হয় তুমি একে কাটবে নতুবা সে তোমাকে। সময় কারও জন্যে নতজানু হয়না। সময় ধারণায় আমরা যদি এতটুকু বুঝে যাই যে আমার একটি দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটা বিষয়ে আমি চাইলেই আখিরাতের জন্যে কিছু করতে পারছি, একই সাথে দুনিয়ার জন্যেও তাহলে মন খারাপের অবকাশ নাই। আল্লাহ আমাদেরকে এতটাই ভালোবাসেন যে, জান্নাতে যাওয়ার মতো আমল করার অনেক সুযোগ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, প্রিয় নবীজি (صلى الله عليه وسلم) কে প্রেরণ করে তার বাস্তব নমুনা দেখিয়েছেন কীভাবে একটা দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহকে রাজি খুশি করা যায়। আর আল্লাহকে রাজি-খুশি করা সময়ের সঠিক ব্যবহারেরই নামান্তর। মুমিনের জীবনের প্রতিটা মুহূর্তই তার জন্যে রহমত কেননা সে আল্লাহকে রাজি খুশি করার কোন সুযোগই ছাড়েনা।
পুরুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছেঃ সংসার জীবন। এটি নিয়ে কথা বললে অনেক কথাই বলে যাবে। তবে সহজ কথায় বলতে হলে: আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্যে একজন পুরুষ বিশেষ একজনের জন্যে নিজেকে সংরক্ষণ করে রাখে। রহমানের বান্দারা দুয়া করে যেন সে এমন একটা জীবনে প্রবেশ করে যার দ্বারা তার চক্ষু শীতল হবে। আর চক্ষু শীতল হওয়া অন্তরের প্রশান্তিরই প্রতিফলন। আল্লাহ রহমানের বান্দাদের পরিচয় তুলে ধরে কুরআনে বলেন,
وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَٱجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
আর যারা প্রার্থনা করে : হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান কর যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও। (২৫:৭৪)
সংসার জীবন ছাড়া এই দুই নিয়ামত (স্ত্রী, সন্তান) চক্ষু শীতলকারী হয়না। বিয়ে ছাড়াও এগুলো পাওয়া সম্ভব কিন্তু সেটা রহমানের বান্দাদের পরিচয় না তথাপি সেই উপাদান তখন তার চক্ষু শীতলের কারণও হবেনা।
পুরুষদের জয় পরাজয়। দুনিয়ার জীবনে জয় পরাজয়, সফলতা, ব্যর্থতার কোন নির্দিষ্ট সঠিক সংজ্ঞা নেই। কিন্তু যে সত্তা এসব কিছুর স্রষ্টা তিনি কিন্তু আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন প্রকৃত সফলতা কী, আল্লাহ কুরআনে বলছেন,
فَمَن زُحْزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدْخِلَ ٱلْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَۗ وَمَا ٱلْحَيَوٰةُ ٱلدُّنْيَآ إِلَّا مَتَٰعُ ٱلْغُرُورِ
যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন হতে রক্ষা করা হল এবং জান্নাতে দাখিল করা হল, অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হল, কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়। (৩:১৮৫)
পুরুষদের জীবনের অন্যতম বড় ফিতনার নাম - নারী। অবিবাহিত কত লক্ষ লক্ষ মুসলিম পুরুষ তাদের চরিত্রে অবৈধ প্রেম-ভালোবাসার দ্বারা কালো দাগ নিয়ে ঘুরছে। আল্লাহর তৌফিকে অনেকে হিদায়াতের পথে এসে পূর্বের পাপকাজের জন্যে লজ্জিত হয়ে তওবা করে, কত রাত আল্লাহর জন্যে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে কান্না করে সেসকল স্মৃতি ভুলতে। দৃঢ় সংকল্প করে অনেকেই নিজের জীবনকে বদলে ফেলে। আল্লাহকে রাজি-খুশি করতে আজীবন সেই পাপের জন্যে তওবা করে যায় কেননা বান্দার জন্যে যে নিরাশ হওয়ার অনুমতি নেই। আল্লাহর ক্ষমার প্রত্যাশী হয় সে।
এই বিষয়ে কেন এখানে কথা আনা হলো? জান্নাতের হুরের নিয়ামতের মাহাত্ম্য উপলব্ধির জন্যে। যে যুবক নিজেকে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখে এবং নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেয়: না, আমি আল্লাহর অবাধ্যতায় জড়িত হবোনা কেননা আল্লাহ আমার জন্যে হুর রেখেছেন যারা আমার জন্যে জান্নাতে অপেক্ষা করছে। এভাবে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আল্লাহকে, আল্লাহর কথাকে সামনে রাখলে জীবন অনেকটাই সুন্দর হয়ে উঠতো। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে: আমরা আমাদের রবকেই ভালোভাবে চিনিনা, জানিনা, ফলস্বরূপ মানাও হয়না...
যে পুরুষ আল্লাহকে রাজি-খুশি করে, আল্লাহর প্রিয় বন্ধু/হাবীব রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) এর মতো জীবন চালায় সেই প্রকৃতপক্ষে জয়ী। সেই ইনশাআল্লাহ জান্নাতি। সেই সফল পুরুষ...
আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করুন, আমিন...