নিশ্চয়ই আমি মানুষকে ক্লান্তি এবং কষ্টের মধ্যেই সৃষ্টি করেছি! মানুষ কি ধারণা করেছে কেউ কখনোই তার উপর ক্ষমতাবান হবে না?

 ㅇ ঘটনা ১

গল্পের আসরে খুব জমিয়ে গল্প হচ্ছে। এক আন্টি বললেন,‌‌ তার মেয়েটি এক বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার আগে চুলগুলো সোজা/স্ট্রেট করার জন্য উবু হয়ে মাথা নিচু করে চুলের উপর ইস্ত্রি চালিয়ে দিয়েছেন। এটা অনেক বছর আগের কথা। তখন চুল সোজা করার স্ট্রেইটনারগুলো এত অ্যাভেলেবল ছিল না।
কথাটা শুনে দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। একজন মেয়ে তার মাথাটা টেবিলে উবু করে চুলগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে এক সাইডে। এবং আরেকজন ইস্ত্রি দিয়ে চুলের উপর ডলা দিচ্ছে যাতে চুলগুলো সোজা হয়ে যায়। সেই সোজা চুল দেখতে সুন্দর লাগবে। সুন্দর দেখানোর জন্য এমন আনকম্ফোর্টেবল পজিশন থেকে এরকম কষ্ট করাটাকে সে সানন্দে মেনে নিয়েছে।

ㅇ ঘটনা ২


ঈদের অনুষ্ঠানে বসেছিলাম আমার এক আপুর পাশে। একটু পর পর ঐ‌‌ বোনের চোখ দিয়ে দেখি পানি পড়ছে। ভারী করে চোখে মেকআপ করা। এতবার পানি পড়ে মেকআপ নষ্ট হচ্ছে। তার চোখ লাল হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পরে কাহিনী বোঝা গেল, তার চোখে “ফলস আইল্যাশ” লাগানো। অর্থাৎ নকল চুল দিয়ে বানানো চোখের পাপড়ির এক্সট্রা লেয়ার লাগিয়েছে যেন চোখগুলোকে আরো সুন্দর লাগে।
চোখের মতো একটা সেনসিটিভ জায়গায় এরকম শক্ত আঠা দিয়ে পাপড়ি লাগানোর অভ্যাস তার আগে ছিল না। আজকে শখ করে লাগিয়েছে। আর চোখের পানি নাকের পানিতে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এক্সট্রা টিস্যু আনতে সে উঠে চলে গেল। অনেক কিছু চিন্তা করে মানুষটার জন্য আমার মায়া লাগলো।

ㅇ ঘটনা ৩

খুব শখ করে পার্লার থেকে সেজেছিল বউ তার বিয়ের দিন।তার সবচেয়ে স্পেশাল দিনে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ তাকে দেখবে যে, সে সবচেয়ে সুন্দর!! ঘন্টার পর ঘন্টা একভাবে পার্লারে বসে থেকে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল। পার্লারের মহিলার বকাও খেলে কয়েকটা। সবকিছুই হজম করছে, কারণ স্পেশাল দিনে তাকে সবচাইতে সুন্দর দেখাতে হবে। শুধু স্বামীর সামনে না, দাওয়াতে যারা আসবে প্রত্যেকটা ছেলে মেয়ের সামনে।
সারাদিন মূর্তির মত বসে থেকে অচেনা অজানা মানুষদের সাথে ৫০০+ সেলফি তুলে, প্রচন্ড ক্লান্তি কান্না এবং নার্ভাসনেস নিয়ে ফাইনালি যখন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় হবে, দেখা গেল তার চুলগুলো যেন এক-একটা বাঁশের চাটাই হয়ে গিয়েছে! কী ব্যাপার?
বোঝা গেল, পার্লারের মহিলা এত বেশি পরিমাণে হেয়ার স্প্রে দিয়েছে খোপা সেট হয়ে থাকার জন্য, যে এই চুল শক্ত হয়ে আর তো নড়ছেই না!
এই চুল নিয়ে তো ঘুমাতেও পারবে না। দুই ঘণ্টা ধরে, লাল হয়ে যাওয়া ক্লান্তিকর চোখ নিয়ে, তেল দিয়ে মাখিয়ে মাখিয়ে চুলগুলো কোন মতে একটা জাতে নিয়ে আসা গেল।
_ _ _

এগুলো সবই সত্যি ঘটনার আলোকে লেখা। কিছু নিজের চোখে দেখা, তো কিছু শোনা। এই ঘটনাগুলো আমাকে কুরআনের একটা আয়াত ভীষণভাবে মনে করিয়ে দেয়।
সূরা বালাদের ৪ নাম্বার আয়াত, আল্লাহ বলছেন,
“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে ক্লান্তি এবং কষ্টের মধ্যেই সৃষ্টি করেছি! মানুষ কি ধারণা করেছে কেউ কখনোই তার উপর ক্ষমতাবান হবে না?”
অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ তাদের নিজ নিজ পথে বেশ কষ্ট করছে। খাটাখাটুনি করছে।
এই যে বেপর্দা হয়ে সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য এত এত কষ্ট স্বীকার করা! এত খাটাখাটুনি করা। এই খাটাখাটুনির চূড়ান্ত ফলাফল কী? দিনশেষে সব মেকি কমেন্টগুলো হারিয়ে যাবে, আর পুঞ্জীভূত হওয়া গুনাহর পাহাড় গুলো জমে থাকবে আল্লাহর কাছে।
অপরদিকে দেখুন, যারা পর্দানশিন তারাও খাটাখাটুনি করছে। গরমের মধ্যে দুই লেয়ার কাপড় পড়ে থাকা। অনেকের অ্যাজমা/শ্বাসকষ্ট, মাইগ্রেনের মাথাব্যথা ইত্যাদি অনেক প্রবলেম থাকে। তা সত্বেও অনেক কষ্ট স্বীকার করে গলায়, মুখে, মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে রাখছে।
অনেক মানুষের কাছে তির্যক মন্তব্য শোনার পরেও নিজেকে আপাদমস্তক ঢেকে রাখছে। দরদর করে ঘেমে পিঠ জামার সাথে লেগে যাচ্ছে। মুখে হাঁসফাঁস লাগছে, কিন্তু তাও এভাবেই বের হচ্ছে। এই কষ্টের ফলাফল কী? সব বাঁকা মন্তব্য গুলো একদিন হারিয়ে যাবে; কিন্তু পুঞ্জিভূত হওয়া নেকির পাহাড় গুলো আল্লাহর কাছে জমা থাকবে!
সুবহানাল্লাহ!
“আহারে! কীভাবে এত ঢেকে রাখ? তোমার গরম লাগে না?”
হ্যাঁ অবশ্যই গরম লাগে, কষ্টও লাগে। সেই সাথে শাড়ি পড়ে, ভারী মেকআপ করাও কষ্টের। সেই সাথে নকল পাপড়ি আঠা দিয়ে চোখের উপর লাগিয়ে দেওয়া, গরম ভাপ নিয়ে চুল সোজা করা–এগুলোর কোনটাই খুব সুখকর না। এত কষ্ট স্বীকার যে আমরা নাফসকে সন্তুষ্ট করতে করছি, তার সিকি ভাগও যদি আল্লাহকে সন্তুষ্টি করতে আত্মশুদ্ধির জন্য আমরা করতাম, আমাদের অবস্থা আজ অন্যরকম হতো!
সবাই কষ্ট করছে।‌ পার্থক্য হচ্ছে কিছু মানুষ তার কষ্টের বিনিময়ে জান্নাত এবং রাজপ্রাসাদ পাওয়ার আশা করতে পারে। এবং কিছু মানুষ তাদের কষ্টের বিনিময়ে, না দুনিয়াতে মূল্যবান কিছু পাবে, না আখিরাতে কিছু পাবে!

Post a Comment

Previous Post Next Post